| আজাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের সংগ্রামী ভুমিকা | জুলফিকার আহমদ কিসমতী |
|---|---|
| প্রকাশনীঃ | অজ্ঞাত |
| বইয়ের সাইজঃ | ৩-এমবি |
| পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ | ১২৬ |
| বইয়ের ফরম্যাট | PDF E-BOOK |
| বিভাগঃ | ইসলামী আন্দোলন |
| কৃতজ্ঞতায়ঃ | বাগী কুঞ্জালয় পাঠাগার |
প্রাক-ইংরেজ আমলের ভারত
আজাদী আন্দোলনের সূচনা সম্পর্কিত আলোচনায় স্বাভাবিক ভাবেই গোলামীর যুগ ও তার পটভূমি সম্পর্কে একটি জিজ্ঞাসা জাগে। এ জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজতে গিয়ে ইতিহাস থেকে আমরা এটাই জানতে পারি যে, তাওহীদ, রেসালাত ও আখেরাত-ভিত্তিক ইসলামী জীবনধারা থেকে বিচ্যুতির ফলে যেমন পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে মুসলমানরা দুর্বা ও বিদেশী দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ হয়েছিল, তেমনি হিমালয়ান উপমহাদেশেও তারা মোগলপতন যুগে প্রথমে শিখ-মারাঠা কর্তৃক বিপর্যন্ত ও পরে ইংরেজদের দাসত্বশৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সম্রাট আলমগীর আওরঙ্গজেবের পর থেকেই উপমহাদেশের মুসলমানদের শাসন ক্ষমতায় পতনের সূচনা ঘটে। আওরঙ্গজেবের তিরোধানের পর তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যারা দিল্লীর মসনদে আলীন হয়েছিলেন, তাদের বেশীর ভাগই ছিলেন অযোগ্য ও দুর্বল শাসক। ধর্মীয়, চিন্তাগত, নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বন্ধ্যাত্ব এবং পতন দেখা দিয়েছিলো তা রোধ করার মতো ক্ষমতা তাদের মোটেই ছিল না।" কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসকগণ নিজেদেরকে নামেমাত্র দিল্লীর অধীন বলে প্রকাশ করলেও কার্যতঃ ঐসব আঞ্চলিক শাসক স্বাধীন শাসনকর্তা হিসাবেই সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহ শাসন করতেন।
উপমহাদেশের মুসলিম শাসন ক্ষমতার এ দুর্বলতা লক্ষ্য করেই বণিক হিসাবে আগত ইংরেজরা এদেশের শাসক হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। পরিণামে, ঘরের ইঁদুরদের কারণে পলাশীযুদ্ধে ইংরেজদের হাতে মুসলমানদের বিপর্যয় ঘটে। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শাসক নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রে ইংরেজরা পরাজিত ও হত্যা করে। এভাবে ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের যুদ্ধে বাংলা দখল করার মধ্য দিয়েই ইংরেজদের সেই স্বপ্নসাধ পূর্ণ হতে থাকলো। পলাশী যুদ্ধের পর দিল্লী কেন্দ্রকে লক্ষ্যস্থল স্থির করে তারা ধীরে ধীরে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলো। একের পর এক কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন মুসলিম অমুসলিম শাসকদের স্বাধীন রাজ্যগুলোকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করলো। আযাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের ভূমিকা
মওলানা শাহ আবদুল আজীজের বিপ্লবী ফতওয়া
ঠিক এ সময়ই 'ওয়ালিউল্লাহ আন্দোলনে'র প্রধান নেতা ও তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র শাহ আবদুল আজীজ দেহলতী এক বিপ্লবী ফতওয়া প্রচার করে এই হতোদ্যম জাতিকে পথের সন্ধান দেন এবং তাদেরকে ইসলামের জেহাদী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হবার আহবান জানান। শাহ আবদুল আজীজ তাঁর পিতা মহামনীষী ও ইসলামী রেনেসাঁর উদপাতা — আজাদী আন্দোলনে
হযরত শাহ ওয়ালী-উল্লাহ দেহলভীর তিরোধানের পর (১৭৬৭ খৃঃ) থেকে দিল্লীর রহিমিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ওয়ালীউল্লাহ চিন্তাধারায় প্রচার, জনসংগঠন প্রভৃতির মাধ্যমে "তারগীবে মুহাম্মদী" নামে ইসলামী পুনর্জাগরণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এই নির্ভীক মুজাহিদ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ফতোয়ার মাধ্যমে ঘোষণা করলেন যে-
"এখানে (ভারতে) অবাধে খৃস্টান অফিসারদের শাসন চলছে, আর তাদের শাসন চলার অর্থই হলো, তারা দেশরক্ষা, জননিয়ন্ত্রণ বিধি, রাজস্ব, খেরাজ, ট্যাক্স, ওশর, ব্যবসায় পণ্য; চোর-ডাকাত-দমনবিধি, মোকদ্দমার বিচার, অপরাধমূলক সাজা প্রভৃতিতে (যেমন- সিভিল, ফৌজ, পুলিশ বিভাগ, দীওয়ানী ও ফৌজদারী, কাস্টমস ডিউটি ইত্যাদিতে) নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় অধিকারী। এ সকল ব্যাপারে ভারতীয়দের কোনই অধিকার নেই।
অবশ্য এটা ঠিক যে, জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ, আজান, গরু জবাই- এসব ক্ষেত্রে ইসলামের কতিপয় বিধানে তারা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে না। কিন্তু এগুলোতো হচ্ছে শাখা-প্রশাখা; যে সব বিষয় উল্লিখিত বিষয়সমূহ এবং স্বাধীনতার মূল যেমন- মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার তার প্রত্যেকটিই ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং পদদলিত করা হয়েছে। মসজিদসমূহ বেপরোয়াভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, জনগণের নাগরিক স্বাধীনতা খতম করে দেয়া হয়েছে। এমন কি মুসলমান হোক কি হিন্দু-পাস-পোর্ট ও পারমিট ব্যতীত কাউকে শহরে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। সাধারণ প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদেরকে শহরে আসা-যাওয়ার অনুমতি দানও দেশের স্বার্থে কিংবা জনগনের নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে না দিয়ে নিজেদের স্বার্থেই দেওয়া হচ্ছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যেমন সুজাউল-মুলক, বেলায়েতী বেগম প্রমুখ ইংরেজদের অনুমতি ছাড়া বাইর থেকে প্রবেশ করতে পারছেন না। দিল্লী থেকে কলকাতা পর্যন্ত তাদেরই আমলদারী চলছে। অবশ্য হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ ও রামপুরের শাসনকর্তাগণ ইংরেজদের আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়ায় সরাসরি নাছারাদের আইন সেখানে চালু নেই। কিন্তু এতেও গোটা দেশের উপরই 'দারুল হরবের-ই হুকুম বর্তায়।" -ফতওয়ায়ে আজীজী (ফারসী), ১৭ পৃঃ মুজতাবীয়া প্রেস।
সাইয়েদ আহমদের নেতৃত্বে মুক্তি সেনারা এগিয়ে চল্লো
সাইয়েদ আহমদ বেরলভী বেশ হৃদয়ঙ্গম করছিলেন এবং বারবার প্রচার করছিলেন যে, প্রকৃত মুসলিম সমাজ সংগঠন করতে হলে শক্তি ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার দরকার। তিনি এই উদ্দেশ্যে সীমান্তে কাজ শুরু করেন যে, আন্দোলনের কেন্দ্র স্থাপন করতে হলে শত্রু থেকে দূরে একটি স্বাধীন এলাকার দরকার। তাছাড়া তিনি ভেবেছিলেন, সীমান্তের যুদ্ধপ্রিয় গোত্রগুলো তাঁর সহায়ক হবে।
আলেম সমাজের সংগ্রামী ভূমিকা এভাবে অবিভক্ত ভারতের সর্বত্র জেহাদের প্রস্তুতি ও প্রচারণা শেষ করে সাইয়েদ আহমদ ১৮২৬ খৃষ্টাব্দে রায়বেরিলী ত্যাগ করেন। সাইয়েদ সাহেবের সঙ্গে এ সময় মোজাহিদের সংখ্যা ছিলো ১২ হাজার; অল্প দিনের মধ্যেই তা এক লক্ষে উন্নীত হয় ।
তারা গজনী কারুল ও পেশোয়ারের পথে নওশেরায় হাজির হলে পর শিখদের সাথে সংঘর্ষ বাধে। উল্লেখ্য, শিখগণ ঐ সময় রণজিৎ সিংহের নেতৃত্বে পাঞ্জাবে আধিপত্য বিস্তার করে মুসলমানদের উপর অকথ্য জুলুম অত্যাচার চালাচ্ছিল। এ অত্যাচারের পেছনে ইংরেজদেরও উস্কানি ছিলো। যা হোক, উক্ত সংঘর্ষে মাত্র ৯ শত মোজাহিদের সাথে বিপুল সংখ্যক শিখ সৈন্য পরাজয় বরণ করলো। সারা সীমান্ত প্রদেশ মুজাহিদদের প্রশংসা মুখর হয়ে উঠলো। কিছুদিন পর শের সিংহ ও জনৈক ফরাসী জেনারেলের অধীন প্রায় তিরিশ হাজার শিখ সৈন্য পুনরায় মুজাহিদদের মোকাবেলা করতে আসে। কিন্তু মুজাহিদ বাহিনী এগিয়ে আসলে শিখরা পনজতারে পিছু হটে যায় এবং সেখান থেকে খন্ডযুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। মুজাহিদদের এই বিরাট সাফল্য জনগণের উপর মস্তবড় প্রভাব বিস্তার করে।
| আল ফিকহুল আকবর বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা - খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর | ডাউনলোড |
|---|---|
| তাফসীরে ইবনে কাসীর সকল খন্ড ডাউনলোড | ডাউনলোড |
| আল কুরআনে অর্থনীতি pdf download | ডাউনলোড |
ফাঁসিকাষ্ঠে ২৮ হাজার মুসলমান ও সাত শত আলেমের শাহাদাত বরণ
জেহাদে মুসলমানরা পরাজিত হলো। উপমহাদেশের মুসলমান পূর্বাপেক্ষা অধিকতর শক্তভাবে বাঁধা পড়লো ইংরেজদের দাসত্বের জিঞ্জিরে। থানাভবনের এলাকাকে ধংসযজ্ঞে পরিণত করা হলো। বিচারের কোনরূপ অপেক্ষা না করে ভারতের অন্যান্য এলাকার মতো এখানেও প্রকাশ্য রাস্তায় নির্মমভাবে মুসলমানদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হলো। উচ্চপদস্থ ইংরেজ অফিসারদের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, এই সেক্টরে ২৭/২৮ হাজার মুসলমানকে বিনা বিচারে ফাঁসি দেয়া হয়েছে এবং প্রায় সাতশো বিশিষ্ট আলেমকে ফাঁসিকাষ্ঠে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে। এছাড়া বহু ওলামা ও বুযর্গানে দ্বীন আন্দামান প্রভৃতি দ্বীপে নির্বাসিত হয়েছেন। তাঁরা দেশবাসী ও আত্মীয় পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিদারুন দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়েছেন। মওলানা ফজলে হক খায়রাবাদী, মওলানা মুফতী এনায়েত আলী এবং শাহ আহমদ সাঈদ ১৮৫৭ সালের 'বিপ্লব ষড়যন্ত্র মামালায়' দণ্ডিত হন। প্রথম দু'জন মুজাহিদকে উক্ত ষড়যন্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্থ করে ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে আন্দমানে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তাঁরা জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। (হায়াতে মাদানী) আজাদী আন্দোলনে-
বলা বাহুল্য, শুধু থানাভবন এলাকায় যেই বিপুল সংখ্যক মুসলমান ও আলেম শহীদ হয়েছেন, সে হিসাবে গোটা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কি পরিমাণ মুসলমান ও আলেম ওলামাকে শহীদ করা হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। (এক পরিসংখ্যান মোতাবেক আজাদী হাসিল পর্যন্ত ২০ লক্ষ মুসলমান এই মুক্তি সংগ্রামে দুশমনদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন)
এ জেহাদে থানাভবন ফ্রন্টে মওলানা কাসেম নানতুবীর মস্তকে গুলির আঘাত লেগেছিল কিন্তু তা মারাত্মক ছিল না বলে কোনপ্রকারে তিনি রক্ষা পেয়ে যান। মওলানা রশীদ আহমদ গংগোহী এই মুক্তি সংগ্রামের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে ছয় মাস কারাগারে অন্তরীণাবদ্ধ ছিলেন। হযরত মওলানা কাসেম নানতুবী এবং হাজী এমদাদুল্লাহর বিরুদ্ধেও গ্রেফতার পরওয়ানা জারি হয়েছিল। মওলানা নানতুবী বন্ধুবান্ধবদের পরামর্শে এবং ইসলামী আন্দোলনের স্বার্থে প্রথম তিন দিন আত্মগোপন করে থাকলেও পরে তিনি দিব্বি রাস্তা-ঘাটে ঘোরাফেরা করতে থাকেন। কেউ তাঁকে সতর্ক করতে গেলে তিনি এই উক্তি করতেন যে, প্রিয় নবী 'হিরা' গুহার মধ্যে কাফেরদের নিকট থেকে মাত্র তিনদিন আত্মগোপন করে ছিলেন, কাজেই আমি তার বেশী করতে রাজি নই। তাতে যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হোকনা কেন আমি হাসিমুখে তা বরণ করে নেবো। আল্লাহর মর্জি, তিনদিন পরেই তাঁর উপর থেকে গ্রেফতারী ওয়ারেন্ট তুলে নেয়া হয়।
১৮৫৭ সালের ইংরেজ বিরোধী গনজোদের মূলে ছিল ইসলামী চেতন তার অন্যতম নায়ক ছিলেন উক্ত তিন বুজর্গ। কিন্তু আল্লাহর অসীম মেহেরবানী উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শকে উজ্জীবিত রাখার স্বার্থে কিভাবে তাঁরা বেচে গেলেন, তা সত্যই এক বিস্ময়কর ঘটনা।